রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:০৫
ইমাম হাসান আসকারি (আ.) : আহলুল বাইতবিরোধী ২৫০ বছরের ষড়যন্ত্রের অবসানকারী

ইসলামী চিন্তাবিদ ও হাওজায়ে ইলমিয়ার বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ মোহাম্মদ তাকি কাদেরি তাঁর এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর ইমামতকাল, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘ইমাম হাসান আসকারি (আ.) : ২৫০ বছরের ষড়যন্ত্রের অবসানকারী’ শীর্ষক এই নিবন্ধে লেখক আহলুল বাইত (আ.)-এর ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।

আহলুল বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ
লেখকের মতে, হিজরতের ১০ম বছর থেকে ২৬০ হিজরি পর্যন্ত প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে আহলুল বাইত (আ.)-কে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখার বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালানো হয়। তিনি এই প্রক্রিয়াকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন।

প্রথম পর্যায়: রাজনৈতিক প্রান্তিককরণ
সাকিফা বনি সাঈদার ঘটনার পর ইসলামী নেতৃত্বের প্রশ্নে যে পরিবর্তন ঘটে, লেখকের মতে তার ফলে ইমাম আলী (আ.) প্রত্যাশিত নেতৃত্বের অবস্থান থেকে দূরে সরে যান এবং আহলুল বাইত (আ.) রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

দ্বিতীয় পর্যায়: রাজনৈতিক ও শারীরিক দমন
উমাইয়া শাসনামলে আহলুল বাইত (আ.)-কে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে রাখা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের ওপর বিভিন্ন ধরনের দমন-পীড়ন চালানো হয়। লেখকের বর্ণনায়, এই সময়ে ইমাম হাসান (আ.), ইমাম হুসাইন (আ.) এবং ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বিরুদ্ধে কঠোর নিপীড়ন নীতি অনুসরণ করা হয়।

তৃতীয় পর্যায়: রাজনৈতিক, শারীরিক ও বংশগত নিপীড়ন
আব্বাসীয় শাসনের প্রথম যুগে ইমাম বাকির (আ.), ইমাম জাফর সাদিক (আ.), ইমাম মূসা কাজিম (আ.) এবং ইমাম রেজা (আ.)-কে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। পাশাপাশি আলভী ও সায়্যিদ বংশের সদস্যদের ওপরও কঠোর নজরদারি ও নির্যাতন চালানো হয়।

চতুর্থ পর্যায়: ইমামতের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা
ইমাম জাওয়াদ (আ.), ইমাম হাদি (আ.) এবং ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর যুগে আব্বাসীয় শাসকরা আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করে। লেখকের মতে, তারা—
• অল্প বয়সে ইমামদের শাহাদাতের মাধ্যমে তাঁদের প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করে;
• ইমাম হাদি (আ.) ও ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-কে সামরায় কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখে;
• ইমাম মাহদি (আ.)-এর জন্ম রোধের উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবারকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখে;
• এবং কারবালার পবিত্র মাজার ধ্বংসের মাধ্যমে শিয়া আন্দোলনের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রকে দুর্বল করার চেষ্টা চালায়।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা
লেখকের মতে, অত্যন্ত সংকটময় এই সময়ে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) দূরদর্শিতা ও কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে আহলুল বাইত (আ.)-এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন এবং বিরোধীদের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেন।

১. ইমাম মাহদি (আ.)-এর জন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) তাঁর পুত্র ইমাম মাহদি (আ.)-এর জন্মকে নিরাপদ রাখেন। লেখক এ ঘটনাকে আহলুল বাইত (আ.)-এর ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে: “তারা আল্লাহর নূরকে তাদের মুখের ফুঁয়ে নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেন, যদিও অবিশ্বাসীরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আস-সাফ, আয়াত ৮)

২. গায়বতের যুগের জন্য শিয়াদের প্রস্তুত করা: ইমাম হাসান আসকারি (আ.) তাঁর অনুসারীদের এমন এক সময়ের জন্য মানসিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত করেন, যখন দ্বাদশ ইমাম প্রকাশ্যে উপস্থিত থাকবেন না।

তিনি তাঁর নিকটবর্তী অনুসারীদের কাছে ইমাম মাহদি (আ.)-এর পরিচয় তুলে ধরেন এবং তাঁকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেন। একই সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের পরিবর্তে প্রতিনিধি ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা জোরদার করেন, যা পরবর্তী গায়বতের যুগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩. প্রতিনিধি (ওকালতি) নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ: শিয়া সম্প্রদায় তখন ইরাক, ইরান ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য ইমাম হাসান আসকারি (আ.) প্রতিনিধি-ভিত্তিক একটি সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করেন।

কুফা, বাগদাদ, নিশাপুর, কুম, খোরাসান, ইয়েমেন, রাই, আজারবাইজান, সামরা, জুরজান ও বসরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তিনি অনুসারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেন।

৪. আরবাঈনের জিয়ারতকে জীবন্ত রাখা: আব্বাসীয় শাসকদের নানা বাধা সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) আরবাঈনের জিয়ারতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে আরবাঈনের জিয়ারতকে মুমিনের অন্যতম পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “মুমিনের পাঁচটি নিদর্শন রয়েছে: দৈনিক একান্ন রাকাত নামাজ, আরবাঈনের জিয়ারত, ডান হাতে আংটি পরা, সিজদায় কপাল মাটিতে রাখা এবং উচ্চস্বরে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পাঠ করা।”

লেখকের মতে, এই শিক্ষার ফলে কারবালার স্মৃতি ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ যুগে যুগে জীবন্ত থেকেছে। বর্তমানে আরবাঈন উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো-লাখো মানুষ নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

নিবন্ধে উপসংহারে বলা হয়েছে, ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এমন এক সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন আহলুল বাইত (আ.)-এর অস্তিত্ব, নেতৃত্ব ও ধারাবাহিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। তাঁর দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি শিয়া সম্প্রদায়কে একটি নতুন যুগের জন্য প্রস্তুত করেন এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর ধারাবাহিকতা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সূত্র: হাওজা নিউজ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha